সকল মেনু

গেম খেলছে কিশোর, নাকি কিশোরকে খেলাচ্ছে গেম?

বর্তমান সময়ে তরুণ ও কিশোরদের একটি বড় অংশ অনলাইনভিত্তিক ব্যাটল রয়্যাল গেমের প্রতি তীব্রভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে পাবজি ও ফ্রি ফায়ার নামের গেম দুটি সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করছে। সারাক্ষণ মোবাইল স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকা এবং ভার্চুয়াল লড়াইয়ের জগতে ডুবে থাকার কারণে তাদের মধ্যে খিটখিটে মেজাজ, অতিরিক্ত রাগ এবং আগ্রাসী আচরণ বেড়েই চলেছে। এই অতিরিক্ত আসক্তির ফলে তরুণ প্রজন্মের মানসিক আচরণে বড় ধরনের নেতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব
অতিরিক্ত গেম খেলার ফলে কিশোরদের মানসিক ধৈর্যের মাত্রা দ্রুত কমে যাচ্ছে। গেমে হেরে গেলে কিংবা ইন্টারনেট সংযোগে সমস্যা দেখা দিলে তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছে। অনেক সময় পড়াশোনা বাদ দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই স্থানে বসে থাকার ফলে তাদের মস্তিষ্কে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়। গবেষকদের মতে, সহিংসতার দৃশ্যসংবলিত গেম মানুষের স্বাভাবিক সহানুভূতি ও ধৈর্য কমিয়ে দেয়। এর ফলে পরিবারের সদস্য বা বন্ধুবান্ধবের ছোটখাটো কোনো কথায় তারা অতিরিক্ত রেগে যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করার মতো ঘটনাও ঘটছে।

সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
ভার্চুয়াল জগতের কৃত্রিম অর্জনের পেছনে ছুটতে গিয়ে কিশোররা বাস্তব পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। পরিবার ও সমাজের মানুষের সঙ্গে মেশার আগ্রহ তাদের মধ্যে দিন দিন কমে যাচ্ছে। সারা দিন ঘরের কোণে দরজা বন্ধ করে স্মার্টফোনে ব্যস্ত থাকায় তাদের সামাজিক দক্ষতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাস্তব জীবনের কোনো চ্যালেঞ্জ বা সমস্যার মুখোমুখি হলে তারা ধৈর্য ধরে তা সমাধান করতে পারছে না। সামান্য বাধা পেলে তারা চরম হতাশ হয়ে পড়ছে এবং নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে।

পড়াশোনায় অমনোযোগী
গেমের নেশা তরুণদের দৈনন্দিন রুটিন ও পড়াশোনার দিকটি পুরোপুরি এলোমেলো করে দিচ্ছে। স্কুল-কলেজের ক্লাসে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। রাতের পর রাত জেগে গেম খেলার কারণে ঘুমের চক্র নষ্ট হচ্ছে। এর ফলে সকালে ক্লান্ত শরীর নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে এবং পরীক্ষার ফল খারাপ হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগের রাতেও বইয়ের বদলে মোবাইল নিয়ে গেমে ব্যস্ত থাকছে, যা তাদের ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি তৈরি করছে।

শারীরিক জটিলতা
দীর্ঘ সময় একভাবে বসে স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে কিশোরদের শারীরিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার পাশাপাশি মাথাব্যথা, পিঠের ব্যথা ও ঘাড়ের সমস্যা নিয়মিত দেখা দিচ্ছে। কায়িক পরিশ্রম বা খেলাধুলা থেকে দূরে থাকার কারণে অল্প বয়সে মুটিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। অনেক কিশোর ঠিকমতো খাবার খাওয়া বা ঘুমানোর সময় পর্যন্ত মনে রাখছে না, যা তাদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

কেস স্টাডি
১. ঢাকার ধানমন্ডির একটি স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী গোলাম রাব্বী। সারা দিন পাবজি গেম খেলা ছিল তার নিত্যদিনের রুটিন। গত মাসে তার মা পড়াশোনার জন্য মোবাইলটি কেড়ে নিলে সে ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। খাবার খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। পরে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তাকে এই আসক্তি থেকে ফেরানোর চেষ্টা করা হয়।

২. উত্তরায় বসবাসকারী কলেজছাত্র রামিম হাসান ফ্রি ফায়ার খেলায় এতটাই আসক্ত হয়ে পড়ে যে, সে তার মা-বাবার কাছ থেকে টাকা চুরি করে গেমের জন্য ব্যয় শুরু করে। একপর্যায়ে তার পরিবার তাকে গেম খেলতে নিষেধ করায় সে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি দেয়। এ ছাড়া দরজা-জানালায় সজোরে আঘাত করে হাত জখম করে।

৩. পুরান ঢাকার এক কিশোরের অভিভাবক জানান, তাদের ছেলে সারারাত গেমে ব্যস্ত থাকায় দিনের বেলা ক্লাসে ঘুমানো শুরু করে। গত বছর শিক্ষক তার অভিভাবককে ডেকে পাঠানোর পর যখন তাকে মোবাইল ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়, তখন সে পরিবারের ওপর চড়াও হয় এবং একপর্যায়ে আত্মহত্যার হুমকি দেয়। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে দীর্ঘ সময় ডিজিটাল ডিভাইস থেকে দূরে রাখা হয়।

বিশেষজ্ঞের মতামত
কিশোরদের গেমিং আসক্তি নিছক কোনো বাতিক নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকে গভীর মানসিক নিঃসঙ্গতা। সিটি হাসপাতাল লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ সাইকোথেরাপিস্ট, সুপারভাইজার ও মানসিক স্বাস্থ্য প্রশিক্ষক মাহমুদা মোহসিনা বুশরা খবরের কাগজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন।

তিনি তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, ‘আমার একজন কিশোর ক্লায়েন্ট ছিল। তার বাবা-মা দুজনই ব্যস্ত থাকতেন। ছেলেটি দিনের বেশির ভাগ সময় তার বৃদ্ধ দাদির সঙ্গে থাকত। বাসায় একজন গৃহকর্মী থাকলেও দিন শেষে এমন কেউ ছিল না, যার সঙ্গে সে নিজের কথা বলতে পারে, গল্প করতে পারে।

স্কুলেও তার অভিজ্ঞতা ভালো ছিল না। সহপাঠীরা তাকে বুলিং করত। তার কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিল না। ফলে তার মধ্যে গভীর একাকিত্ব তৈরি হয়েছিল। স্কুল থেকে বাসায় ফিরে কথা বলার মতো কেউ না থাকায় সে পাবজি বা ফ্রি ফায়ার খেলতে বসত।

বাইরে থেকে আমরা হয়তো ভাবতে পারি, ছেলেটা এত গেম খেলে বলেই তার মেজাজ খারাপ হচ্ছে। কিন্তু একজন সাইকোথেরাপিস্ট হিসেবে আমি বিষয়টি একটু অন্যভাবে দেখি। আমি জানতে চাই, সে গেমের মধ্যে আসলে কী পাচ্ছে?

বাস্তব জীবনে যেখানে সে একা, গেমের মধ্যে সেখানে সে একটি গোষ্ঠীর অংশ হতে পারছে। সেখানে তার বন্ধু আছে, যোগাযোগ আছে, প্রতিযোগিতা আছে, কিছু অর্জন করার সুযোগ আছে। এমনকি গেমের মধ্যে তার একটি পরিচয়ও তৈরি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, সেখানে সে মনে করছে, সে কারও অংশ।’

মাহমুদা মোহসিনা বুশরা আরও বলেন, সব ক্ষেত্রে গেমকে শুধু সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। অতিরিক্ত গেম খেলা অবশ্যই সমস্যা তৈরি করতে পারে। তবে অনেক সময় এর পেছনে আরও কিছু বিষয় কাজ করে। রয়েছে একাকিত্ব, বুলিং, স্বীকৃতি পাওয়ার অনুভূতি, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অভাব কিংবা নিজের জন্য নিরাপদ জায়গা না থাকা।

একজন কিশোর হয়তো মুখে বলছে না, ‘আমি খুব একা’ বা ‘আমাকে কেউ বুঝতে পারে না’। কিন্তু তার আচরণের মধ্য দিয়ে সে হয়তো সেটাই প্রকাশ করছে।

বুশরা বলেন, তাই বাবা-মাকে শুধু ‘মোবাইল কেড়ে নিন’ বা ‘গেম বন্ধ করে দিন’ বললে হবে না। আগে সন্তানের কাছে যেতে হবে, তার সঙ্গে কথা বলতে হবে। জানতে হবে, সে গেম খেলতে এত পছন্দ করে কেন, স্কুলে তার দিন কেমন কাটে, তার কোনো বন্ধু আছে কি না, কোনো সমস্যা হলে সে কার সঙ্গে কথা বলে। শুধু গেম বন্ধ করে দিলে সমস্যার মূল কারণ দূর নাও হতে পারে। বরং বাবা-মাকে সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলার অভ্যাস করতে হবে। প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিট সময় দিতে পারলেও সেটি গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় পড়াশোনা বা ফল নিয়ে কথা না বলে তার দিন কেমন গেল, কী ভালো লাগল, কী খারাপ লাগল এসব নিয়ে কথা বলা যেতে পারে।

বুশরা বলেন, বুলিংয়ের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। স্কুলে কোনো শিশু বুলিংয়ের শিকার হলে তাকে শুধু ‘এড়িয়ে চলো’ বললেই হবে না। স্কুল, শিক্ষক ও বাবা-মাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে সে স্কুলে নিরাপদ বোধ করে।

সুস্থ সামাজিক পরিবেশ তৈরির পরামর্শ দিয়ে তিনি আরও বলেন, একা থাকা শিশু বা কিশোরদের জোর করে বন্ধু বানাতে না বলে খেলাধুলা, গান, চিত্রাঙ্কন বা অন্য কোনো ইতিবাচক কার্যক্রমে যুক্ত করতে হবে। এতে সমবয়সীদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে যোগাযোগ তৈরির সুযোগ হবে।

হঠাৎ করে গেম খেলা পুরোপুরি বন্ধ না করে পরিবারের সবার সঙ্গে আলোচনা করে একটি যুক্তিসংগত রুটিন তৈরি করা উচিত। কখন গেম খেলবে, কখন পড়াশোনা করবে, কখন ঘুমাবে এবং কখন শারীরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেবে এসব নির্ধারণ করা যেতে পারে। বাবা-মাকে কেবল সন্তানের গেমিং আচরণ নয়, বরং তার মানসিক অবস্থার প্রতিও যত্নবান হতে হবে। কিশোরদের নিয়মের মধ্যে বাঁধার আগে তাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাও অনুধাবন করা জরুরি।

বুশরা আরও বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাবা-মা যেন শুধু সন্তান কতক্ষণ গেম খেলছে–সেটি না দেখেন। তার মানসিক অবস্থার দিকেও নজর দিতে হবে। সে কি খুব একা হয়ে যাচ্ছে? স্কুলে যেতে ভয় পাচ্ছে? সব সময় রেগে থাকছে? ঘুম বা মেজাজে পরিবর্তন এসেছে? কোনো কিছুতেই আগ্রহ পাচ্ছে না? এসব লক্ষণ দেখা গেলে একজন মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত বিষয়টি শুধু গেম খেলা বা না-খেলার নয়। কিশোরকে নিয়ন্ত্রণ করার আগে তাকে বুঝতে হবে। তার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, কথা বলার জায়গা তৈরি করতে হবে। সন্তানকে সময় দেওয়া মানে শুধু তার পাশে থাকা নয়; তার অনুভূতি ও মানসিক জগতের জন্যও জায়গা তৈরি করা।

কিশোরদের এই বিপজ্জনক আসক্তি থেকে রক্ষা করতে অভিভাবকদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে। সন্তানদের সারাক্ষণ ইন্টারনেটে পড়ে থাকার পরিবর্তে মাঠের খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত করতে হবে। তাদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করে সমস্যার কথা শুনতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে ডিজিটাল আসক্তি দূর করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP