২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডার কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য-বিষয়ক গবেষক অ্যান কারসন। নোবেল কমিটি বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) তাদের ওয়েবসাইটে বলেছে, ‘ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত ও সৃজনশীল সংলাপের মধ্য দিয়ে সমকালীন সাহিত্যের নতুন রূপ সৃষ্টিতে সাহসী ও অভিনব সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ অ্যান কারসনকে ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।’
ধ্রুপদি সাহিত্যের সঙ্গে আধুনিক জীবনের নানা অভিজ্ঞতাকে মিলিয়ে নিজের আলাদা লেখার ধরন তৈরি করেছেন অ্যান কারসন। তাঁর পুরো নাম অ্যান প্যাট্রিসিয়া কারসন। ১৯৫০ সালের ২১ জুন কানাডার টরন্টোতে তাঁর জন্ম। স্কুলে পড়ার সময় প্রাচীন গ্রিক ভাষার প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। পরে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্রুপদি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন। স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়েছেন। এরপর কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন তিনি।
প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও দর্শনের প্রতি কার্সনের আগ্রহ তাঁর লেখায় বারবার ফিরে এসেছে। তবে পুরোনো গল্পকে শুধু নতুন করে বলাই তাঁর উদ্দেশ্য নয়। প্রাচীন কোনো চরিত্র বা কাহিনিকে তিনি বর্তমান সময়ের মানুষের প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, বিচ্ছেদ, শোক কিংবা পরিচয়ের মতো অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। ফলে তাঁর লেখায় প্রাচীন পুরাণ ও সাহিত্যের সঙ্গে আধুনিক মানুষের জীবনের গল্প একসঙ্গে উঠে আসে।
পুরাণের গল্পে আধুনিক মানুষের অনুভূতি
কার্সনের প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ বই ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে প্রেম ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও দর্শনের সাহায্যে দেখিয়েছেন, মানুষের আকাঙ্ক্ষা কীভাবে একই সঙ্গে কাছে টানে এবং দূরেও সরিয়ে দেয়। বইটি প্রবন্ধধর্মী হলেও এতে সাহিত্য ও দর্শনের পাশাপাশি প্রাচীন গ্রিক কবিতারও বিশ্লেষণ রয়েছে।
তাঁর সবচেয়ে পরিচিত বইগুলোর একটি ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে তিনি প্রাচীন গ্রিক পুরাণের চরিত্র গেরিয়নকে নতুনভাবে তুলে ধরেছেন কারসন। গ্রিক কবি স্টেসিকোরাসের লেখা থেকে কাহিনিটির মূল ধারণা নিয়েছিলেন তিনি। এর সঙ্গে যোগ করেছেন প্রেম, একতরফা ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা ও নিজের পরিচয় খোঁজার অনুভূতি। ফলে তা হয়ে উঠেছে আধুনিক মানুষের গল্প।
‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’ বইয়েও প্রেম ও দাম্পত্য সম্পর্কের নানা দিক উঠে এসেছে। ২০০১ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, সৌন্দর্য, আকাঙ্ক্ষা ও বিচ্ছেদের মতো বিষয়কে তিনি তুলে ধরেছেন। বইটির জন্য তিনি টি. এস. এলিয়ট পুরস্কার পান। এই পুরস্কার পাওয়া প্রথম নারীও তিনি।
আর ‘নক্স’ বইটি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ২০১০ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে তাঁর বড় ভাই মাইকেল কার্সনের জীবন ও মৃত্যুর স্মৃতি উঠে এসেছে। বইটিতে কবিতা, ছবি, অনুবাদ ও ব্যক্তিগত স্মৃতিকে একসঙ্গে ব্যবহার করেছেন তিনি।
কার্সনের অন্য উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স’, ‘ডিক্রিয়েশন’, ‘রেড ডক’ ও ‘নর্মা জিন বেকার অব ট্রয়’। এসব বইয়েও পুরাণ, ইতিহাস ও আধুনিক জীবনের নানা বিষয়কে নিজের মতো করে মিলিয়েছেন তিনি।
কবিতা ও অনুবাদের পাশাপাশি শিক্ষকতাও
অ্যান কারসন একজন অনুবাদকও। সফোক্লিস, স্যাফো ও ইউরিপিদিসের মতো প্রাচীন গ্রিক লেখকদের রচনা অনুবাদ করেছেন তিনি। প্রাচীন এসব রচনাকে আধুনিক পাঠকের কাছে নতুনভাবে তুলে ধরার নিজস্ব ধরন রয়েছে তাঁর অনুবাদে।
শব্দের ইতিহাস ও উৎপত্তি নিয়েও কার্সনের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। কোনো শব্দ কোথা থেকে এসেছে, সময়ের সঙ্গে তার অর্থ কীভাবে বদলেছে—এসব বিষয় তাঁর লেখায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের বড় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও পুরাণকে তিনি টেনে এনেছেন আজকের মানুষের প্রেম, শোক, আকাঙ্ক্ষা ও ব্যক্তিগত জীবনের গল্পে।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি দীর্ঘ সময় শিক্ষকতাও করেছেন কারসন। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্রুপদি সাহিত্য পড়িয়েছেন। তাঁর এই একাডেমিক জ্ঞানই পরে কবিতা, প্রবন্ধ ও অনুবাদের কাজে নানাভাবে ফিরে এসেছে।
সাহিত্যে অবদানের জন্য অ্যান কারসন ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ, গ্রিফিন পোয়েট্রি প্রাইজ ও টি. এস. এলিয়ট প্রাইজসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার পেয়েছেন। ২০২৪ সালে তাঁর ‘রং নর্মা’ বইটি ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ডের কবিতা বিভাগের চূড়ান্ত তালিকায়ও ছিল।
২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের বড় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও পুরাণকে তিনি টেনে এনেছেন আজকের মানুষের প্রেম, শোক, আকাঙ্ক্ষা ও ব্যক্তিগত জীবনের গল্পে। পুরোনো সাহিত্যকে নতুন চোখে দেখা এবং সেই পাঠ থেকে নিজের আলাদা সাহিত্যভাষা তৈরি করাই অ্যান কার্সনের লেখার অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।